শিরোনাম :
নন্দীগ্রামে পৌরসভার নাগরিক সেবায় অ্যাম্বুলেন্স দিলেন এমপি মোশারফ রাজশাহীতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সার্বভৌমত্ব র‍্যালি অনুষ্ঠিত ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত পাবনার সুজানগরে বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি মাছ উৎপাদনের ধুম স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক দিন : দুলু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে ইউজিসির শ্রদ্ধা প্রজ্ঞা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষিতে সফল নেত্রকোণার মহিদুল ৭ নভেম্বর দেশের স্বাধীনতা রক্ষার দিন : রুহুল কবির রিজভী হৃদয়ের সবকিছুই ছিল অসাধারণ : সিমন্স টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন মোহাম্মদ শামি
শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৪ অপরাহ্ন

প্রজ্ঞা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষিতে সফল নেত্রকোণার মহিদুল

প্রতিনিধির নাম / ০ বার পাঠ করা হয়েছে
আপডেট : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬

নেত্রকোনা প্রতিনিধি: প্রথাগত ধ্যানধারণা ও সনাতন পদ্ধতির মোহ ত্যাগ করে মেধা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষিতে আত্মপ্রকাশ করেছেন নেত্রকোণার সফল তরুণ উদ্যোক্তা মো. মহিদুল হাসান মুন্না।

উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশের সিংহভাগ তরুণ যখন একটি চাকরির পেছনে হন্যে হয়ে ছুটেন, তখন স্রোতের বিপরীতে হেঁটে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এবং সৎভাবে হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছেন তিনি।

নেত্রকোণা সদর উপজেলার সিংহের বাংলা ইউনিয়নের ধীতপুর গ্রামের মো. আব্দুস সালাম ও মনোয়ারা আক্তার দম্পতির ৪ সন্তানের প্রথম সন্তান মুন্না পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত জমিতে তিনি গড়ে তুলেছেন অনুকরণীয় ও আধুনিক সমন্বিত কৃষি খামার এবং বাণিজ্যিক এগ্রো-প্ল্যাটফর্ম।

২০২০ সালে টুকটাক কাজের মধ্য দিয়ে তার এ যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে ২০২২ সাল থেকে তিনি পুরোদমে মাঠে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করেন।

নেত্রকোণা সরকারি কলেজ থেকে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জনের পর বর্তমানে তিনি স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে অধ্যয়নরত রয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষির প্রতি তার সুপ্ত দুর্বলতা এবং দেশবাসীকে নিরাপদ ও অর্গানিক খাদ্যপণ্য উপহার দেওয়ার স্বপ্ন তাকে এ পেশায় নিয়ে আসে।

দীর্ঘ গবেষণা, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি ঘাঁটাঘাটি এবং বিশেষ করে, বগুড়ার গোকুলে অবস্থিত বিখ্যাত জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও মালচিং পেপার ব্যবহারের ওপর তিনি বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালে তার এ সাফল্য ও কর্মতৎপরতার স্বীকৃতিস্বরূপ বগুড়ার জার্মপ্লাজম সেন্টার থেকে তাকে ‘উদীয়মান কৃষি উদ্যোক্তা’ হিসেবে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয় এবং খোদ ওই প্রতিষ্ঠানে সফল উদ্যোক্তা ও আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবেও অংশ নেন তিনি।

পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত ২০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই কৃষি সাম্রাজ্যে মুন্না আধুনিক কৃষির প্রায় প্রতিটি শাখার সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।

খামারের উৎপাদন প্রসঙ্গে উদ্যোক্তা মো. মহিদুল হাসান মুন্না বাসসকে বলেন, কৃষির মধ্যে বহু বহুমুখী শাখা-প্রশাখা রয়েছে।

বর্তমানে ৩শ’ শতাংশ জমিতে বাণিজ্যিকভাবে বহুমুখী উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে। ফসলের ক্ষেতের আর্দ্রতা দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা, মাটির পুষ্টিগুণ রক্ষা করা এবং ক্ষতিকর আগাছা দমনে ক্ষেতের বেডগুলোতে মুড়ে দেওয়া হয়েছে আধুনিক মালচিং পেপার।

বিষমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন প্রসঙ্গে মুন্না বাসসকে বলেন, ‘কৃষির ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করা পুরোপুরি সম্ভব, তবে তা একমাত্র জৈব বালাইনাশকের মাধ্যমেই। রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে মানুষের শরীরে ক্যান্সারসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। তাই সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্ভাবনী উপায়ে জৈব বালাইনাশক তৈরি শুরু করি।

তিনি জানান, নিম পাতার রস, নিম তেল, ব্লেন্ডার করা বম্বে মরিচ বা কাঁচামরিচের রস, রসুনের পেস্ট, পেঁপে পাতার রস, সামান্য গুঁড়া সাবান বা পাউডার এবং মেহগনি গাছের তিতা অংশ একসাথে নির্দিষ্ট পরিমাণে মিশিয়ে এ প্রাকৃতিক বালাইনাশক প্রস্তুত করা হয়। এটি একবার স্প্রে করলে ক্ষেতে ১০ থেকে ১৫ দিন কোনো পোকামাকড়ের উপদ্রব হয় না। পাশাপাশি ক্ষতিকর পোকা দমনে হলুদ আঠালো ফাঁদ (ইয়েলো স্টিকি বোর্ড) ও সেক্স ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি জানান, গত জানুয়ারি মাসে ৪০ শতাংশ জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ করে তিনি দুর্দান্ত আর্থিক মুনাফা অর্জন করেন। এরপর বর্ষা মৌসুমে একই জমিতে অফ-সিজনে দেশি লাউ চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য পান। বর্তমানে ওই একই জমিতে মাচা পদ্ধতিতে চাষ করা হচ্ছে সতেজ ও পুষ্টিকর শসা। এছাড়াও শিম, টমেটো, কাঁচা মরিচ ও বেগুনের বাণিজ্যিক প্রজেক্ট চলমান রয়েছে।

খামারের চারপাশজুড়ে রোপণ করা হয়েছে ২ হাজারের অধিক দেশি কলাগাছ। তার উৎপাদিত সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ গাজীপুর এবং ময়মনসিংহের বড় বড় পাইকারি বাজারে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে।

মুন্নার খামারের প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে সুমিষ্ট ‘ব্যানানা ম্যাঙ্গো’র বাগান এবং ৩০ শতাংশ জমিতে চাষ করা হচ্ছে জনপ্রিয় ও লাভজনক ‘বল সুন্দরী’ ও আপেল কুল।

এছাড়া দেশি ও ফ্রিজিয়ান গাভি নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি গবাদিপশুর খামার। গরুর গোবর দিয়ে জ্বালানি ও জৈব সার উৎপাদনের জন্য স্থাপন করা হয়েছে একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। অন্যদিকে তৈরি করা হচ্ছে পুষ্টিকর ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার।

মুন্না অনলাইন ও অফলাইনে গড়ে তুলেছেন প্ল্যাটফর্ম—‘এগ্রোসোমা’ (ধমৎড়ংড়সধ.পড়স) এবং ফেসবুক পেজ ‘এগ্রোসুমা গ্লোবাল’সহ নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল।

এ ডিজিটাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত অনলাইনভিত্তিক। এখান থেকে আমরা কৃষকদের মাঝে মালচিং পেপার, সিডলিং ট্রে, কোকোপিট, শেড নেট, নিম তেল, ফেরোমন ট্র্যাপ, বিভিন্ন ধরনের স্প্রে মেশিন এবং ছোট পাওয়ার টিলার সরবরাহ করছি। রংপুরে আমাদের হাব রয়েছে, যেখান থেকে বড় বড় কোম্পানির মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে মেশিনারিজ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়াও ছাদ কৃষির যাবতীয় সরঞ্জাম এবং গ্যারান্টিযুক্ত বীজ ও জৈব বালাইনাশক আমরা সারা দেশে সাপ্লাই দিয়ে থাকি।’

মুন্নার এ বহুমুখী খামার ও এগ্রো-ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ইতোমধ্যে এলাকার বেশ কয়েকজন বেকার ও কর্মক্ষম যুবকের নিয়মিত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে তার খামারে নিয়মিতভাবে পাঁচজন শ্রমিক কাজ করছেন।

হাঁস এবং ছাগলের খামার স্থাপনের কাজও এ উদ্যোক্তার পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত ‘এগ্রোসোমা’ কোম্পানিকে দেশের প্রতিটি জেলা, থানা এবং উপশহর পর্যায়ে সম্প্রসারিত করার সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন রয়েছে।

তবে এ বিশাল স্বপ্ন বাস্তবায়নে আর্থিক চ্যালেঞ্জ ও অন্তরায় রয়েছে বলে মহিদুল বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর বর্তমান চড়া সুদের হার কৃষিনির্ভর ব্যবসার সম্প্রসারণ ও প্রসারের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। সরকার যদি সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা, কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করে, তবে এ খামার প্রকল্পটিকে বড় পরিসরে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।’

তরুণ এ উদ্যোক্তার সাফল্য প্রসঙ্গে নেত্রকোণা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বাসসকে অত্যন্ত আশাবাদী সুরে বলেন, ‘আমাদের দেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজ প্রথাগত চাকরির পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে যেভাবে একজন সফল ও আত্মবিশ্বাসী উদ্যোক্তা হিসেবে কৃষিক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে, তা সামগ্রিক অর্থে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। মুন্না তার খামারে বহুমুখী ফসল চাষের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং জৈব প্রযুক্তির অত্যন্ত সফল প্রয়োগ ঘটিয়ে ব্যবসার একটি চমৎকার ও অনুকরণীয় মডেল তৈরি করেছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এ ধরনের সৃষ্টিশীল ও উদ্যোমী তরুণদের সব ধরনের প্রযুক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও পরামর্শমূলক সহায়তা নিয়মিত প্রদান করা হচ্ছে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর