সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত হাওর, নদী ও পাহাড়ের অনন্য রূপবৈচিত্র্যের জেলা সুনামগঞ্জ। এ জেলায় রয়েছে দেশের সম্ভাবনাময় কৃষি শিল্প। এক সময় এ জেলার কৃষকরা শুধু ধান আবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন।
তবে বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরে কৃষিতে বৈচিত্র্য এনেছেন সুনামগঞ্জ জেলার কৃষকরা। বোরো ও আমন ধানের পাশাপাশি মৎস্য খামার ও সবজি আবাদ করে জীবনমানের পরিবর্তন করছেন সুনামগঞ্জের কৃষকরা। ধান চাষের পাশাপাশি এখন সবজি আবাদে বেশ ঝুঁকছেন কৃষকরা।
চলতি বছর সুনামগঞ্জ জেলায় ১২ হাজার ৭শ’ ৭১ হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। গত বছরের তুলনায় এবার ১১ হেক্টর বেশি জমিতে সবজি আবাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলার সদর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার ও জামালগঞ্জ উপজেলার উঁচু এলাকাগুলোতে এ ধরনের চাষ বেশি হয়।
সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর, সুরমা ও রঙ্গারচর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে শীতকালীন সবজির আবাদ শুরু করেছেন কৃষকরা। এসব অঞ্চলের মানুষের মনোবল, দৃঢ় থাকায় জীবন যুদ্ধে তারা ককনো থেমে থাকেনি। অনাবাদি (ঝোপ-জঙ্গল) জমি আবাদের আওতায় এনে ঘরবাড়ি নির্মাণসহ চাষযোগ্য জমিতে পরিণত করছেন কৃষকরা। এখন কৃষকদের পরিশ্রমে পতিত ও অনাবাদি জমিতে সবুজের সমারোহ।
ভোর হলেই দেখা যায় সুরমা ও জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়নের কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্যতা। কেউবা জমিতে নিড়ানি দিচ্ছেন, কেউ ফসলের পরিচর্চা করছেন। কেউ আবার সবজি (ফসল) বাজারে নেওয়ার জন্য জমি থেকে সংগ্রহ করছেন। এভাবেই কৃষকদের ঘামঝড়া পরিশ্রমে চাষ হচ্ছে সবজি। এভাবেই স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এসব সবজি বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন জেলার কৃষকরা।
ধান চাষের পাশাপাশি কম সময়ে সবজি উৎপাদনে কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে পরিণত হয়েছে। এর ফলে পরিবর্তন আসছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। পাশাপাশি বেকারদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে।
হুড়ারকান্দা গ্রামের কৃষক মোস্তফা মিয়া বাধা কপি ও ফুল কপির আবাদ করছেন।
তিনি বাসসকে বলেন, সবজি আবাদ করে আগে যেভাবে লাভ হতো, এবার কি হবে তা বুঝে উঠেেত পারছি না। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পরিবহন ও সেচের সমস্যাসহ পোকামাকড়ের আক্রমণের পাশাপাশি বাজারজাত করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুরমা ইউনিয়নের কৃষক মনির হোসেন বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারো সবজি আবাদের জন্য জমি বন্ধক নিয়েছি। এ সব জমিতে মরিচ, টমেটো ও ধনিয়ার চাষ করছি। আশা করছি ফলন ভালো হবে।
একই গ্রামের সুমা বেগম বলেন, প্রতিবছর সবজির আবাদ করে লাভবান হচ্ছেন এলাকার কৃষকরা। তাই আমরা সবজি চাষ করি ভালো ফলন ও লাভের আশায়। এবার আমার স্বামী অসুস্থ হওয়ায় জমিতে কাজ করতে পারছেন না। তাই আমি নিজেই সাধ্যমত সবজি ক্ষেতে কাজ করছি। লোন নিয়ে জমি বন্ধক রাখছি।
জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ঝরঝরিয়া এলাকায় বছরে ৩ থেকে ৪ বার ফসল ফলানো হয়। এ জমিগুলো নিয়মিতভাবে চাষাবাদের জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন কৃষকরা।
এদিকে, আগাম উৎপাদিত স্থানীয় সবজি সুনামগঞ্জের বাজারে আসায় স্বস্তি ফিরেছে।
সরেজমিনে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দোকানগুলোতে নানা ধরনের তাজা সবজি রয়েছে। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় কৃষকদের আগাম উৎপাদিত সবজি বাজারে আসায় সরবরাহে পরিবর্তন এসেছে।
শহরতলী মুসলিম নগরের কৃষক বাচ্চু মিয়াসহ অন্যান্য কৃষকরা জানান, বরবটি, ডুগিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছেন।
বাচ্চু মিয়া জানান, ৪৫ শতক জমিতে লাউ এবং ৪৫ শতক জমিতে শসার আবাদ করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার টাকার মতো লাউ বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া জমিতে অন্যান্য সবজি চাষ করেছেন তিনি। এতে তার আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
সুনামগঞ্জে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে আগাম শীতকালীন সবজির আবাদ শুরু হয়। এ সময় লাউ, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলা, টমেটো, লালশাক, মূলাশাক, পালংশাক ও কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করা হয়। এসব ফসলের উৎপাদন ভালো রাখতে নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ, আগাছা পরিষ্কার, প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ ও সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলার প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। বীজ নির্বাচন, সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন ও আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে সহায়তা নেওয়া যাবে। বালাইনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মাত্রা ও নিরাপত্তাবিধি মেনে চলার পাশাপাশি সবজি সংগ্রহের আগে মোড়কে উল্লেখ করা অপেক্ষার সময়ও অনুসরণ করতে হবে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বাসসকে বলেন, সদর উপজেলার ৩টি ইউনিয়নে আগাম শীতকালীন সবজি ফলন শুরু হয়েছে। এরমধ্যে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন, সুরমা এবং গৌরারং ইউনিয়নের কিছু এলাকায় সবজি বিক্রি শুরু করেছেন কৃষকেরা। ৩টি ইউনিয়নে প্রায় ৯শ’ হেক্টর জমিতে সবজি আবাদ করছেন কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বাসসকে বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে সুনামগঞ্জে আগাম শীতকালীন সবজির উৎপাদন বাড়বে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করে অন্য এলাকাতেও সবজি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে এবং জেলার অর্থনীতিতে সুফল আসবে।